শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা পরিবারের জন্য মুহূর্তেই তৈরি করতে পারে চরম আতঙ্ক। তবে এমন পরিস্থিতিতে আতঙ্কিত হয়ে সময় নষ্ট না করে দ্রুত ও পরিকল্পিতভাবে পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কারণ নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা শিশুকে খুঁজে পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি এমনই এক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন এক মা। ৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে তাঁর সাড়ে তিন বছরের মেয়ে বাসার সহকারীর সঙ্গে নিচে যায়। কাছের মুদিদোকান থেকে কিছু কেনাকাটার সময় শিশুটি সহকারীর কাছ থেকে কিছুটা দূরে চলে যায়। পরে সহকারী দেখতে পান, এক নারী শিশুটির হাত ধরে দ্রুত গলির দিকে চলে যাচ্ছেন।
বিষয়টি বুঝতে পেরে তিনি দৌড়ে ওই নারীর কাছে গিয়ে শিশুটিকে কেন নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানতে চান। তখন ওই নারী উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘তোমার বাচ্চা?’ পরে শিশুটিকে নিয়ে দ্রুত সেখান থেকে ফিরে আসেন তিনি।
ঘটনাটি জানার পর শিশুটির পরিবারের সদস্যরা ওই নারীর খোঁজে নিচে গেলেও তাঁকে আর পাওয়া যায়নি। ওই এলাকায় সিসি ক্যামেরা না থাকায় নারীটির পরিচয় বা গতিপথ শনাক্ত করাও সম্ভব হয়নি।
ঘটনার পর ওই মা শিশু নিখোঁজ হলে তাৎক্ষণিকভাবে কী করা উচিত, সে বিষয়ে খোঁজ নেন। বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ ও পুলিশের ব্যবস্থার আলোকে এমন পরিস্থিতিতে কয়েকটি বিষয় দ্রুত করার কথা জানা যায়।
প্রথম এক ঘণ্টায় যা করবেন
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম এক ঘণ্টাকে অনেক সময় ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বলা হয়। এ সময়ে শিশু সাধারণত যে এলাকায় ছিল, তার আশপাশেই থাকার সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই আতঙ্কে সময় নষ্ট না করে একই সঙ্গে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
১. দ্রুত আশপাশে খুঁজুন
শিশুকে সর্বশেষ কোথায়, কখন এবং কার সঙ্গে দেখা গেছে, তা প্রথমে নিশ্চিত করুন। এরপর বাড়ি, সিঁড়ি, ছাদ, গলি, দোকান, খেলার জায়গা, স্কুল, পার্ক, বাসস্ট্যান্ডসহ আশপাশের সম্ভাব্য জায়গায় খোঁজ করুন।
একজনের পক্ষে সব জায়গায় খোঁজা সম্ভব নয়। তাই পরিবারের সদস্য, আত্মীয় ও পরিচিতদের বিভিন্ন এলাকায় ভাগ করে দিন। শিশুটি কোন দিকে যেতে পারে, তার পরিচিত স্থান কোনগুলো এবং কোথায় যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এসব বিবেচনায় নিয়ে খোঁজ করুন।
২. অপেক্ষা না করে পুলিশকে জানান
শিশু নিজে থেকেই ফিরে আসবে এমন আশায় অপেক্ষা করা ঠিক নয়। দ্রুত নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করুন এবং জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ জানান।
নিখোঁজ হওয়ার সময়, স্থান ও পরিস্থিতি পুলিশকে বিস্তারিত জানান। সম্ভব হলে দ্রুত নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডি বা অভিযোগ করুন। আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দ্রুত সংগ্রহ ও পর্যালোচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ। সময় যত গড়ায়, সংশ্লিষ্ট এলাকার ফুটেজ শনাক্ত করা তত কঠিন হতে পারে।
৩. শিশুর প্রয়োজনীয় তথ্য প্রস্তুত রাখুন
পুলিশকে শিশুর সাম্প্রতিক ও পরিষ্কার ছবি দিন। পাশাপাশি শিশুর নাম, বয়স, উচ্চতা, গায়ের রং, পরনের পোশাক ও জুতার বিবরণ এবং শরীরে কোনো বিশেষ চিহ্ন থাকলে তা জানাতে হবে।
শিশুকে সর্বশেষ কোথায় ও কখন দেখা গেছে, সেটিও স্পষ্টভাবে জানান। শিশুর কাছে মুঠোফোন থাকলে সেটিতে কল করুন। ফোনের শেষ অবস্থান, কললিস্ট, মেসেজ বা অন্য কোনো ডিজিটাল তথ্য পাওয়া গেলে তা মুছে না ফেলে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানান।
৪. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়ান, তবে সতর্ক থাকুন
শিশুর সাম্প্রতিক ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে স্থানীয় ও বিশ্বস্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রুপে নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে শিশুকে সর্বশেষ যে এলাকায় দেখা গেছে, সেই এলাকার স্থানীয় গ্রুপগুলোতে তথ্যটি পৌঁছে দেওয়া কার্যকর হতে পারে।
তবে শিশুর জন্মনিবন্ধন নম্বর, পূর্ণ বাসার ঠিকানা বা অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা উচিত নয়। কোনো অপরিচিত ব্যক্তি শিশুকে খুঁজে পেয়েছেন বলে যোগাযোগ করলে নিজে থেকে একা দেখা করতে না গিয়ে পুলিশকে বিষয়টি জানান।
৫. হাসপাতাল ও গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতের স্থানেও খুঁজুন
শুধু বাড়ির আশপাশে খোঁজ করেই থেমে থাকা উচিত নয়। রাস্তার মোড়, গলির মাথা, মূল সড়কের সংযোগস্থল, নিকটবর্তী হাসপাতাল, ক্লিনিক, বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটেও খোঁজ নেওয়া জরুরি।
শিশু পথ হারিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে কি না বা কোনো হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
‘মুন অ্যালার্ট’ ব্যবস্থাও কাজে লাগতে পারে
নিখোঁজ ও অপহৃত শিশুদের দ্রুত উদ্ধারে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং অ্যাম্বার অ্যালার্ট ফর বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে ‘মুন অ্যালার্ট’ (মিসিং আর্জেন্ট নোটিফিকেশন) নামে একটি বিশেষ সেবা চালু করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সালে সিলেটে অপহরণের পর নিহত শিশু মুনতাহার স্মরণে এই অ্যালার্ট সিস্টেমের নামকরণ করা হয়।
দেশের যেকোনো স্থান থেকে শিশু নিখোঁজ হলে সিআইডির টোল ফ্রি হটলাইন ১৩২১৯-এ তথ্য জানানোর কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ‘মুন অ্যালার্ট’-এর ওয়েবসাইটেও নিখোঁজ শিশুর তথ্য রিপোর্ট করা যায়। জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ নম্বরেও যোগাযোগ করা যাবে।
সিআইডির পরিকল্পনা অনুযায়ী, শিশু নিখোঁজ হওয়ার পরবর্তী তিন ঘণ্টাকে গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। জরুরি সতর্কবার্তা ওয়েব পোর্টাল, মোবাইল অ্যাপ, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল বিলবোর্ড, এটিএম বুথ ও প্রয়োজন অনুযায়ী মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থার কথাও জানানো হয়েছে।
নিখোঁজ মানেই অপহরণ নয়
পুলিশ সদর দপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে ১৫ হাজার ৭১৭ শিশু নিখোঁজ হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ শিশুর সন্ধান তখনও মেলেনি। একই সময়ে ১৩ হাজার ৬৭৯ শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে অথবা পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজের সব ঘটনাকে অপহরণ বা পাচারের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির হিসাবের মধ্যে পথ হারানো শিশুও থাকে। বিশেষ করে ছোট শিশুরা পরিবারের সঙ্গে বাইরে গিয়ে আলাদা হয়ে যেতে পারে, নাম-ঠিকানা বলতে না পারায় বাড়ি ফিরতে না পারে কিংবা একা ফেরার সময় অন্য এলাকায় চলে যেতে পারে।
তাই সন্তান নিখোঁজ হলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত দ্রুত পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেওয়া। আশপাশে খোঁজ করার পাশাপাশি পুলিশকে জানানো, প্রয়োজনীয় তথ্য ও ছবি সরবরাহ করা, সিসি ক্যামেরা ও ডিজিটাল তথ্য সংরক্ষণ করা এবং স্থানীয়ভাবে সতর্কতা ছড়িয়ে দেওয়া সবগুলো কাজ যত দ্রুত সম্ভব শুরু করা জরুরি।
শিশু নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। তাই আতঙ্কে স্থির হয়ে না থেকে পরিবারের সদস্যদের কাজে ভাগ করে দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করাই হতে পারে দ্রুত অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ডেস্ক রিপোর্ট, দেশ মিডিয়া।